Recents in Beach

পাহাড়বাসীর দুর্দিনে পাহাড়ি নেতারা কোথায়?


হাসান ফরহাদ হাসুঃ

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের প্রাক্কালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে  পাহাড়ি জনগনের একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এবং সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচিতির স্বীকৃতি সম্পর্কিত কতিপয় দাবি পেশ করেন। পাহাড়ি জনগনের দাবি মেনে নিতে সরকারের ব্যর্থতার ফলে তাদের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নামে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠে। পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে যোগ হয় শান্তিবাহিনী নামে একটি সামরিক শাখা। শান্তিবাহিনী নামক এই  সামরিক সংগঠনটি পার্বত্য অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে থাকে। পার্বত্য অঞ্চলে ঘটতে থাকে একের পর এক গণহত্যা, অপহরন, চাঁদাবাজি , ধর্ষনের মতো  ন্যাক্কারজনক কাজ।

পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য আজ থেকে প্রায় ২১ বছর আগে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃতীয় কোন পক্ষ ছাড়াই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমার সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শান্তি চুক্তির পর ৭২ টি ধারা মধ্যে অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন করেছে সরকার, কিন্তু সন্তু লারমা শান্তি চুক্তির পর রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিলেও পাহাড়ে শান্তি আনার বদলে পর্দার আড়ালে  অশান্তি সৃষ্টি করেই চলছে। এ যেন সর্ষের ভিতরে ভূতের গল্পের মতোই। দেশের ৬৪টি জেলায় সাধারন মানুষ তার ঘরে ঘুমালেও পাহাড়ে বসবাসকারী নিরীহ পাহাড়ি ও বাঙ্গালীরা স্বাভাবিক ভাবে ঘুমাতে পারে না। সারাক্ষন আতঙ্কে থাকে কখন জানি সন্তু লারমার পোষা সন্ত্রাসীরা কাকে তুলে নিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে, মেয়েরা শঙ্কায় থাকে কখন যে সে ধর্ষনের স্বীকার হয়, কেউ জানে না কখন যে কাকে কুপিয়ে  হত্যা করে। এ যেন জাহেলিয়া যুগকেও হার মানায়।

সন্তু লারমা- জে এস এস এর প্রধান। শান্তি চুক্তির সুফল ভোগ করে তিনি বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাসম পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানও বটে।  তিনি শান্তিবাহিনী নামক একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দেন। উল্লেখ্য, সন্তু লারমার আপন বড় ভাই মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তথা এমএন লারমা এই সশস্ত্র সংগঠনের সৃষ্টি করেছিলো। পরবর্তীতে, ক্ষমতালোভী সন্তু লারমা তার আপন ভাই এমএন লারমাকে হত্যা করে নিজেই পিসিজেএসএস’র প্রধান হিসেবে ক্ষমতা দখল করে এবং এই সন্তু লারমা সরকারের কাছ থেকে পাহাড়ে বসবাসকৃত নিরীহ পাহাড়ি ও বাঙ্গালীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর একটি বড় অঙ্কের বাজেট পেয়ে থাকে। কিন্তু আজ যখন পাহাড়বাসী বন্যায় ভাসছে এবং প্রাণ যাচ্ছে পাহাড় ধ্বসে, অনেকেই হচ্ছে গৃহহীন, খাদ্যহীন, বস্ত্রহীন। নিদারুণ কষ্টে জীবন যাপন করছে তারা। পাহাড়ে যখন এরুপ ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে তখন জেএসএস এর প্রধান তথা আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব সন্তু লারমা, ইউপিডিএফ এর প্রধান প্রসীত বিকাশ খীসা এবং সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি বাসন্তি চাকমারা কোথায়? কোথায় স্বঘোষিত রাজা দেবাশীষ রায়? জুম্ম জাতির মুক্তির কথা বলে পাহাড়ি জনগনের কাছ থেকে জোর করে প্রতিবছর যে কোটিকোটি টাকা চাঁদাবাজি আর খাজনা আদায় করে সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে? পাহাড়বাসীর এই দুর্দিনে কেন তারা এক কানাকড়িও সহায়তা দিচ্ছে না? শান্তিবাহিনীর বোন বাসন্তী চাকমা তো প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে বন্যার্তদের জন্য অর্থ এনে অসহায় বন্যার্তদের পাশে না দাঁড়িয়ে, মানবতার ডাকে সাড়া না দিয়ে গত ১৫ই জুলাই বৈশাখী পূর্ণিমা উপলক্ষে খাগড়াছড়ি সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার ৫৬টি বৌদ্ধবিহারে ৭ লক্ষ ৭৩ হাজার টাকার অনুদানের চেক প্রদান করেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় অর্থ ব্যয় করলে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু বন্যার মতো ভয়াবহ দুর্যোগ চলাকালে একজন সংরক্ষিত সংসদ সদস্য কিভাবে ত্রাণ তহবিলের অর্থ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ব্যয় করেন? পাহাড়িদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্টার্জিত টাকাগুলো দেবাশীষ রায় খাজনা আদায়ের নামে লুটেপুটে খাচ্ছে। তিনিও তো তার প্রজাদের এই দুর্দিনে একটা ফুটো পয়সাও দিলেন না। 

এরা নাকি স্বপ্নের জুম্মল্যান্ড গঠনের জন্য, পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করে যাচ্ছে। কিন্তু তাঁরা তো এক মুঠো চাউল নিয়েও অসহায় দুঃস্থদের মাঝে সাহায্যের হাত বাড়ালো না। তাহলে তাঁরা পাহাড়ে কিসের অধিকার আদায়ের নামে আন্দোলন করে যাচ্ছে? ভাবতেই অবাক লাগছে এই দুর্দিনেও অসহায় ক্ষুধার্ত পাহাড়ের মানুষের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় নাই ঐ সব তথাকথিত পাহাড়ি নেতারা। সাহায্যের হাত বাড়াবে কিভাবে? তাঁরা তো ওই চাঁদার টাকা দিয়ে নিজের পরিবারসহ বিলাসবহুল অট্টালিকায় জীবন যাপন করছে। নিজের ছেলেমেয়েদেরকে বিদেশে পড়িয়ে করছে উচ্চ শিক্ষিত। আর পাহাড়ের সাধারণ মানুষগুলোকে বানিয়ে রাখছে অশিক্ষিত। কারন অশিক্ষিত করে রাখলে সেই সব মানুষগুলোকে শাসন ও শোষণ করা তাদের জন্য সহজ। এভাবে অশিক্ষিত পাহাড়িরা ঐ সব ভন্ড নেতাদের অন্ধ বিশ্বাসের গোড়ে পরে বছরের পর বছর ত্যাগ করে যাচ্ছে তাদের ন্যায্য অধিকার। নিরীহ পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের নামে ভন্ড নেতারা মিথ্যে অভিনয় করে যাচ্ছে, মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে।

হে পাহাড়িবাসী এরপরও কি তোমাদের ঘুম ভাংগবে না? এবার তোমরা জাগো এবং এই সব ভন্ড, মুখোশধারী, সুবিধাবাদী আর স্বার্থপর নেতাদের বিরুদ্ধে সোচ্ছার হও। তা নাহলে সারাজীবন এভাবেই তাদের মায়াজালে আটকে নিঃস্ব হয়ে যেতে হবে আর অকালে প্রাণ দিতে হবে জেএসএস-ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের হাতে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ