Recents in Beach

জাতীয় পতাকা অবমাননা এতো ঠুনকো বিষয় না

প্রথমবার আমেরিকা এসে কিছু জিনিস দেখে অবাক বনে যেতাম। কিছুদিন আমি আটলান্টার মেয়র অফিসে কাজ করি। তখন, ওরা সেণ্ট সীমন আইল্যান্ডে একটা গলফ টুর্নামেন্টের আয়োজন করে। আমার বস ইউ এস নেভির অবঃ রিয়ার এডমিরাল (RADM, O8) আমাকে বলেন- আমি গলফ বুঝি কিনা।
জ্বিনা। ভালোভাবে বুঝিনা।
উনি একটা কাগজের উপর গলফের পুরো মাঠটা এঁকে- কিভাবে গলফ খেলে তার একটা ধারণা দিলেন।
জ্বি, এখন বুঝলাম। তা, সেখানে আমার কাজটি কি?
তোমার কাজ হলো তুমি "হোল ইন ওয়ান" এর পাশের চেয়ারে বসে থাকবে। আর যদি দৈবাৎ 'হোল ইন ওয়ান' হয়। তবে ফ্লাগটা ওপরে ওঠাবে। তবে , বিশ্বাস করো। এখানে যে সব প্লেয়ার খেলতে আসছে -এই ঘটনা জীবনেও ঘটবেনা।

আমি "হোল ইন ওয়ানে'র পাশে চেয়ার নিয়ে বসে আছি। তখন সামার সীজন চলছে। নানা রকমের মানুষজন এসেছে । গলফে, গলফের কার্ট, গলফ বল, হ্যাট-সবকিছুতেই আমেরিকার ফ্লাগ। কিন্তু যে জিনিসটা দেখে প্রথমবার ধাক্কা খেলাম তা হলো-ছেলে-মেয়েদের শুধু জুতো না অনেকের আণ্ডারগার্মেন্টস গুলোতেও আমেরিকার ফ্লাগ। প্রচণ্ড দেশপ্রেমিক আমার বুকে ধাক্কা লাগলো। তাদের নিজ দেশের প্রতি এ কেমন অবমাননা?

বসকে বলেই ফেললাম। উনি প্রশ্ন শুনে অবাক। এটা কীভাবে অবমাননা হয়-সেটা যেন উনি বুঝতেই পারছেন না। শুধু বললেন-একটা দেশের সবচেয়ে পবিত্র হলো- সে দেশের মাটি। এখন মাটির ওপর দিয়ে আমরা জুতো পরে হাঁটি। তাতে মাটির কোনো অবমাননা হয়না। অনেকেই নিজের দেশের জন্য যুদ্ধ করে-যুদ্ধাহত সৈন্যের জখমকৃত পা যদি পতাকাদিয়ে ব্যাণ্ডেজ করা হয়- এতে পতাকার অবমাননা হয়না। বরং পতাকার গৌরবই হয়। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি ইচ্ছে করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে পতাকাকে পা দিয়ে স্পর্শ করে তবে সেটা অবশ্যই অবমাননা হবে। তারপর হাসতে হাসতে যা বললনে তার খাঁটি বাংলা করলে হয়- পতাকা নাসায় থাকুক আর পাছায় থাকুক, চাঁদের মাটিতে থাকুক আর জুতোর পাটিতে থাকুক এতে পতাকার কোনো অবমাননা হয়না। অবমাননা এতো ঠুনকো বিষয় না।

ক্রিসমাসে এ দেশের সবাই সবাইকে সাধারণত উপহার দেয়।একেক মানুষের একেক শখ। আমার শখ হলো- নানা রঙের , নানা ডিজাইনের মোজা পরা। আমার পায়ে পরা এই মোজাগুলো বস ইংল্যাণ্ড থেকে নিয়ে এসেছিলেন। কই বৃটেনের এতে কোনো অবমাননা হয়নি। এই কথাগুলোর বলার কারণ- বৃটেনের মাটিতে বাংলাদেশের পতাকার ওপর দাঁড়িয়ে কয়েকজন নামাজ পড়ছেন। এতে নাকি দেশের খুব অবমাননা হয়েছে। দেশপ্রেমিকদের রক্ত এখন টগবগ করে ফুটছে। এবং ভাইরালের শূণ্য মাঠে ছবিটি ইতোমধ্যে ভাইরালও হয়ে গেছে।

পতাকার অবমাননা হয় কখন-

যখন দূর্নীতির মহোৎসবের ভিতর বৃটিশ আমলে বানানো লক্কর ঝক্কর সেতু ভেঙ্গে পড়ে অসহায় মানুষগুলো প্রাণ হারায়। নিজের জীবন বদলাতে ভূমধ্যসাগরে একসাথে ৪৩ টি লাশ ভেসে যায়। আপনার সন্তানকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে লাখ টাকার ঘুষ চুক্তি হয়,
আইসিইউতে মৃত মানুষের ডায়ালাইসিস হয়, ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা লুট হয়, পুলিশের পকেটে ইয়াবা পাওয়া যায়, আফ্রিকার জঙগলে জন্তুদের তাড়াবার জন্য যে হর্ণ ব্যবহার করা হয়- সে একই হর্ণ যখন এদেশের গাড়িতে আর মোটর বাইকে লাগিয়ে অনর্থক পাঠা ছাগলের মতো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করা হয়, নদী-খাল দখল ভরাট করে একটি দেশকে বিপর্যয়য়ে দিকে প্রতিনিয়ত ঠেলে দেয়া হয়, মাদ্রাসার শিক্ষক যখন নিজ ছাত্রীকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেন, সেনানিবাসের পাশে তনুরা ধর্ষিতা হয়, ফেলানীদের লাশ কাটা তারে ঝুলে থাকে, কাতার এয়ারপোর্টের ভিতর একবার আটকা পরা কিছু বাংলাদেশী ভাইদের পেয়েছিলাম। কয়েকদিন ধরে না খাওয়া। কয়েকটি বার্গার আর কয়েকটি চকলেটের প্যাকেট কিনে দিলে বুভুক্ষু মানুষের মতো যারা হুমড়ি খেয়ে পরেছিলেন- এসব কিছুতেই দেশের পতাকার অবমাননা হয়।

কিন্তু জাতীয় পতাকাকে জায়নামাজ বানিয়ে নামাজ পড়লে দেশের কোনো অবমাননা হয়না। আহা! যদি কয়েক সেকেণ্ড পরেই ছবিটি তোলা হতো তবে হয়তো দেখা যেতো যারা পতাকার ওপর দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন- প্রিয় দেশের এ পতাকাটিকে সিজদায় গিয়ে কত পবিত্রভাবে তাদেরই কপাল স্পর্শ করেছে। কিন্তু এরকম পবিত্রময় ছবি তোললেতো আর পাবলিক খাবেনা। ইস্যুও হবেনা।”

(লেখক: আরিফ মাহমুদ)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ