Recents in Beach

পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নে সেনাবাহিনীর ভূমিকা (ভিডিওসহ)




(ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন)

পার্বত্য চট্টগ্রামে মোতায়েনের পর থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনার মাধ্যমে আইন শৃংখলা পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্য সেবা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধার ও ত্রান তৎপরতার মত জন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকান্ডে রাষ্ট্রের অপরিহার্য সেবক হিসেবে ধারাবাহিক ভাবে সক্রিয় রয়েছে। সেই সাথে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের অন্যান্য সংস্থাসমূহকে সহায়তা প্রদান করছে। সেনা সদস্যদের নিরলস কর্মকান্ড, নিরবিচ্ছিন্ন সম্পৃক্ততা, শ্রম ও ত্যাগের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পরিবেশ বিরাজমান।



সেনাসদস্যরা স্বাস্থ্য সেবামূলক কর্মকান্ডের আলোকে দূর্গম পাহাড়ি অঞ্চলসমূহে প্রতিনিয়ত বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ঔষধ প্রদান, চক্ষু শিবির, ধাত্রী প্রশিক্ষণ, বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানীয় জলের উপর সচেতনতা বৃদ্ধি ও সরবরাহ এবং সাধারণ স্বাস্থ্য-বিধি বিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করে থাকে। যেখানে কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই সে সমস্ত জায়গায় হেলিকপ্টারের মাধ্যমে মেডিকেল টিম পাঠিয়ে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করে সেনাসদস্যরা।



পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারে সেনাবাহিনী বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। এখানে সেনাবাহিনীর সরাসরি অর্থায়ন ও উদ্যেগে বেশ কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলেজ পরিচালিত হয়। সেনাসদস্যরা বিভিন্ন স্কুল-কলেজ গুলোতে বিনামূল্যে চেয়ার, টেবিল, বই, খাতা, কলম, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রদান করে থাকে।



পাশাপাশি দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় পাঠশালা প্রোগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে স্থানীয় শিশুদেরকে স্কুলে যেতে উৎসাহিত করে। ডিজিটাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সাজেকের মত দূর্গম এলাকাতেও শিক্ষার আলো পৌঁছে দিচ্ছে সেনাসদস্যরা। সেই সাথে পিছিয়ে পড়া উপজাতি জনগোষ্ঠীর শিক্ষার মান উন্নয়নে তাদের জন্য আবাসিক হোস্টেল নির্মান করেও শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় মুরং কমপ্লেক্স, রুমা উপজেলার বম হোস্টেল এবং রাংগামাটির ঘাগড়াতে ত্রিপুরা মহিলা হোস্টেল যার প্রকৃত উদাহরণ।



পার্বত্যাঞ্চলের নারীদের যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ দানের মাধ্যমে বহুমুখীভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক নিয়মিতভাবে কম্পিউটার, সেলাই মেশিন, হস্তশিল্প, ধাত্রীবিদ্যা ইত্যাদি প্রশিক্ষণ কর্মকান্ড পরিচালনা করা হয়। সেই সাথে সুবিধা বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া যুবকদের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে ট্রাস্ট টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এর আওতায় বিনামূল্যে কম্পিউটার ও ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে।



প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা অন্য কোন কারণে জুমের ফসল কম উৎপাদিত হলে জুম চাষের উপর নির্ভরশীল ঐ অঞ্চলের উপজাতিরা তীব্র খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হয়। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ঐ সমস্ত দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টারযোগে ত্রান ও খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেয়।



পার্বত্য জেলা সমূহে স্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিবেশ বজায় রাখার জন্যও সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে
, পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন সমূহের চাঁদাবাজি, খুন, গুম, ধর্ষণ রোধসহ আইন শৃংখলা পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, আনসার এবং স্থানীয় গন্যমান্য নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে কাজ করছে সেনাবাহিনী।



সেই সাথে স্থানীয় উপজাতি-বাঙ্গালি সম্প্রদায়কে একত্রিকরণ করে
Community Monitoring and Alert Mechanism দল গঠন করার মাধ্যমে স্ব স্ব এলাকা পর্যবেক্ষণ, নিরীক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রাক-সতর্কমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার পদ্ধতি চালু করেছে সেনাসদস্যরা।

তাছাড়া, সেনাবাহিনী পার্বত্যাঞ্চলে ঐতিহ্যগত উৎসব ও আয়োজনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি এখানকার জনসাধারণকে আধুনিক জীবন ব্যবস্থায় আনয়নের জন্য নিয়মিতভাবে সংস্কৃতি চর্চা, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত অনুষ্ঠানে সহায়তা, উন্মুক্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং কনসার্ট ইত্যাদির আয়োজন করে থাকে যা উপজাতি-বাঙ্গালি সকলেই স্বতঃস্ফুর্ততার সাথে উপভোগ করে। জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ধর্মের মানুষের জন্য ধর্মীয় উপাসনালয় তৈরী বা সংস্কার এবং ধর্মীয় উৎসব পালনে আর্থিক সহযোগিতাও প্রদান করে থাকে সেনাবাহিনী। 



দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনকালীন সময়ে উক্ত স্থানে ব্যালট বক্স এবং প্রিজাইডিং অফিসারদের গমনাগমনের জন্য সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে হেলিকপ্টার সহায়তা প্রদান করা হয়।



ভূমির গঠণ এবং অবস্থানগত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় প্রতিবছরই বন্যা
, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ধস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দূর্যোগ সংঘটিত হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ সমস্ত প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলায় সর্বদা দুর্গতদের পাশে এসে দাঁড়ায়। বিশেষ করে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা এবং দুর্গতদের মধ্যে ত্রানসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে তাদের অসামান্য সাফল্যের দৃষ্টান্ত। এ সমস্ত দুর্যোগে রাস্তাঘাটসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে চৌকষ সেনাসদস্যরা নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে অতি অল্পসময়ে তা আবার চলাচলের উপযোগী করে তোলে।



এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকান্ড থেকে মানুষের জানমাল রক্ষা
, চিকিৎসা সহায়তা প্রদান, রান্না করা খাবার এবং ত্রান সামগগ্রী বিতরণ করে সেনাসদস্যরা তাদের পাশে দাঁড়ায়। এছাড়াও, শীতবস্ত্র বিতরণ করে স্থানীয় মানুষের কষ্ট লাঘব করে তারা।  



সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং সেনাসদস্যদের নিরবিচ্ছিন্ন প্রয়াসে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ১৬শো কিলোমিটার সড়কসহ নির্মান করা হয়েছে অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সড়ক ও জনপদ বিভাগের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন এ সমস্ত রাস্তা
, কালভার্ট ও ব্রীজ নির্মাণ করছে। এতে করে পার্বত্য জেলাগুলোর সাথে বাংলাদেশের মূল সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার সংযোগ হওয়ায় ঐ অঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতি-বাঙ্গালি জনগোষ্ঠীসহ দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। 



কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী কর্তৃক অবৈধভাবে গাছ এবং কাঠ কেটে পার্বত্য জেলার রিজার্ভ ফরেস্টের বনাঞ্চল উজাড় নিরসনে সেনাসদস্যরা নিয়মিতভাবে টহল কার্যক্রম করে থাকে। সেনাসদস্যদের এরুপ তৎপরতার কারণে রিজার্ভ ফরেস্ট ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে বৃক্ষরোপন কর্মসূচী পালন করে বনায়ন সৃষ্টিতে সেনাসদস্যরা ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।


পার্বত্য অঞ্চল সব সময়ই পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। কিন্তু অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপত্তার অভাবে এ অঞ্চলের পর্যটনখাত পিছিয়ে ছিল দীর্ঘদিন। সাম্প্রতিককালে সেনাসদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণে গড়ে তোলা হয়েছে নীলগিরি, সাজেক, আরন্যক এবং লেকভিউ আইল্যান্ড এর মতো বিলাসবহুল ও আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র যা ইতিমধ্যে দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষন করতে সক্ষম হয়েছে। পর্যটন শিল্পের এই বিকাশের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রবাহমান সম্পদ, সৌন্দর্য্য ও বৈচিত্রময় জীবন ধারাকে বজায় রেখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মূলতঃ বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পার্বত্য পর্যটন শিল্প বিকাশের ধারাকে অব্যাহত রাখছে।


পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি-বাঙ্গালি সম্প্রীতি তথা সহাবস্থান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারী বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন এই মূল মন্ত্রকে সামনে রেখে পাহাড়ি-বাঙ্গালি সম্প্রীতি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে সেনাবাহিনী।


পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান শান্তি অর্জনের নেপথ্যে রয়েছে সেনাবাহিনীর বহু সদস্যের আত্মত্যাগ, অকল্পনীয় শ্রম ও নিষ্ঠা। দায়িত্ব পালনকালে সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য অকাতরে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। দুর্গম এলাকার ক্যাম্পে অপ্রতুল রশদ সরবরাহের মধ্যেই অপারেশন পরিচালনা করতে গিয়ে সেনাসদস্যদের দিনের পর দিন শুকনা খাবার খেয়ে জীবনধারণ করতে হয়। ব্যথা, আঘাত, ক্ষত, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়ায় কত দিন-রাত কাটে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে। খারাপ আবহাওয়া বা আলোর স্বল্পতার কারণে হেলিকপ্টার না আসতে পারার কারণে প্রয়োজনের মূহুর্তে হাসপাতালে নেয়া যায়নি বলে মুমুর্ষ রোগীকে প্রাণ দিয়ে হয়েছে-এমন অফিসার ও সৈনিকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তবুও সম্পৃক্ত ও নিবেদিত প্রান সেনাসদস্যরা পার্বত্য চট্টগ্রাম ও এখানে বসবাসকারী জনসাধারণের জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। 

লেখকঃ রিফাত শাহেদ রিদম

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ