Recents in Beach

তিন পার্বত্য জেলার পটভূমি


রাংগামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম গঠিত। এই তিন পার্বত্য জেলার রয়েছে বেশ সমৃদ্ধ ইতিহাস। আমাদের আজকের আয়োজন এই তিন পার্বত্য জেলার ইতিহাস এবং পটভূমি আপনাদের সামনে তুলে ধরাঃ  

খাগড়াছড়ি:

১৮৮৩ সনের ৭ই নভেম্বর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা গঠিত হয় ২২.৩৮ ডিগ্রী হতে ২৩.৪৪ ডিগ্রী উওর অক্ষাংশ ৯১.৪২ ডিগ্রী হতে ৯২.১১ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে এর অবস্থাপাহাড়, ছোট ছোট নদী, ছড়া সমতল ভূমি মিলে এটি একটি পরু সৌন্দর্যমন্ডিত ঢেখেলানো এলাকাচেংগি, মাইনি ফেণী প্রভৃতি জেলাউল্লেখ্যযোগ্য নদী এছাড়াও এতে য়েছে ৩৩৬৮ টি পুকুর, জলাশ দীঘি যার ৬৭% খাস জেলার উত্তর ও পশ্চিমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে চট্টগ্রাম ও রাংগামাটি জেলা এবং পূর্বে রাংগামাটি জেলা অবস্থিত। মোট আয়তন ২৬৯৯.৫৫ র্গ কিলোমিটার উঁচু ভূমির পরিমাণ ৮৫% (প্রায়) এবং সমতল ভূমির পরিমাণ ১৫% (প্রায়) জেলামোট ১২১ টি মৌজা রয়েছে যার ধ্যে ৮৮ টি মং সার্কেল ৩৩ টি চাকমা সার্কেলের অন্তর্ভুক্তমং সার্কেলের আওতাধীন এলাকাগুলো হচ্ছে খাগড়াছড়ি সদর, মাটিরাঙ্গা, রামগড়, মানিকছড়ি, মহালছড়ি, পানছড়ি লক্ষীছড়ি উপজেলার আংশিক এবং চাকমা সার্কেলের অধীনে লক্ষীছড়ি উপজেলার আংশিক দীঘিনালা উপজেলাগ্রামের সংখ্যা ৩৫৩, ইউনিয়ন ৩৫ টি, উপজেলা ০৮টি, থানা ০৯ টি, পৌরসভা ০৩টি

প্রশাসনঃ অত্র জেলায় মোট ০৯টি উপজেলা রয়েছে এগুলো হচ্ছে খাগড়াছড়ি সদর, মাটিরাঙ্গা, গুইমারা, রামগড়, মানিকছড়ি, লক্ষীছড়ি, মহালছড়ি, দিঘীনালা পানছড়ি১৯৯৮ সনে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ (সংশোধন)  আইন, ১৯৯৮ এর আওতায় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ স্থাপন করা হয় পরিষদ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অধীনে থেকে কাজ করে যাচ্ছে 

খাগড়াছড়ির
ঐতিহাসিক পটভূমিঃ ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত অত্র এলাকাটি কখনো ত্রিপুরা, কখনো বা আরাকান রাজন্যবর্গ দ্বারা শাসিত য়েছে ন্মধ্যে ৫৯০ হতে ৯৫৩ খিষ্টাব্দ পর্যন্ত মোট ৩৬৩ বছর ধরে ত্রিপুরা রাজাগণ বংশ পরম্পরায় পার্বত্য চট্রগ্রাম (খাগড়াছড়িসহ) চট্রগ্রাম শাসন করেঅতপর ৯৫৩ খৃষ্টাব্দ হতে ১২৪০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত আরাকান রাজাগন ২৯৭ বছর ব্যাপী এলাকা শাসন করলেও তদপরবর্তীতে ১০২ বছরব্যাপী (১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত) পুনরায় ত্রিপুরা রাজাগন এলাকা কর্তৃত্ব করেনইতিহাস সূত্রে জানা যায় দশমতাব্দী থেকে ঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত ত্রিপুরা রাজাগ ০৮ বার, আরাকান রাজাগ ০৯ বার এবং গৌড়ের সুলতানগণ (মুসলিম) ০৬ বার এলাকাটি দখলে নেনঅবশেষে ১৩৪২ খৃষ্টাব্দ হতে ত্রিপুরা রাজার শাসন ক্ষমতার আওতা হতে মুসলিম শাসক সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ চট্রগ্রামসহ এ এলাকার নিয়ন্ত্রন নেনমুসলিম শাসনের ধারাবাহিকতায় ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক বাংলার মসনদ দখল পরবর্তীকালে নবাব মীর কাশিম আলী খানের রাজত্বকালে ১৭৬০ খৃষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার নবাব মীর কাশিমের করতল থেকে চট্রগ্রাম অধিকার করেন অতঃপর ১৭৬১ খৃষ্টাব্দে ১৪ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সরকারের সাথে স্বাধীন ত্রিপুরা মহারাজার যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। যুদ্ধে ত্রিপুরা রাজার পরাজয়ের প্রেক্ষিতে উভয়ের ধ্যে এক চুক্তি সম্পাদিত হয়উক্ত চুক্তির নম্বর ধারা অনুসারেচট্রগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের রাজস্ব প্রশাসনিক নির্বাহী ক্ষমতা ইংরেজ সরকার এর হাতে ন্যস্ত থাকবেবলে উল্লেখ থাকায় প্রকৃত পক্ষে তখন থেকে পার্বত্য চট্রগ্রাম ত্রিপুরা মহারাজার শাসন ক্ষমতা ত্রিপুরা রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়
ব্রিটিশ সরকার ১৭৬০ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে বাংলানবাব মীর কাশিমের হাত থেকে চট্রগ্রাম এবং ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপুরার মহারাজার কবল থেকে পার্বত্য চট্রগ্রামের (অংশ বিশেষের) উপর চূড়ান্তভাবে কর্তৃত্ব লাভ করে অতপর ১৮৬০ খৃষ্টাব্দের ২৬শে জুনের নোটিফিকেশন নং-৩৩০২ অনুসারে পার্বত্য চট্রগ্রামকে চট্রগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বতন্ত্র জ়েলা হিসাবে ঘোষণা করা হয়পরবর্তীকালে ইংরেজ সরকার পার্বত্য চট্রগ্রামকে শাসন রাজস্ব সংগ্রহের সুবিধার্থে ১৮৮১ খৃষ্টাব্দে ১লা সেপ্টেম্বর মং, চাকমা ও বোমাং নামে তিন সার্কেলে বিভক্ত করেঅধিকন্তু, ব্রিটিশ সরকার ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে “পার্বত্য চট্রগ্রাম ফ্রন্টিয়ার পুলিশ অ্যাক্ট” প্রবর্তন করে স্থানীঅধিবাসিদের সমন্বয়ে স্বতন্ত্র একটি পুলিশ বাহিনীও গড়ে তোলেপার্বত্য চট্রগ্রাম জেলা হিসাবে ঘোষিত হবার পর থেকে র্থাৎ ১৮৬০ খৃষ্টাব্দের ২২ নং আইন, ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দের ৪ নং আইন এবং ১৮৭৩ খৃষ্টাব্দের ৩ নং বিধি ও ১৮৮১ খৃষ্টাব্দের ৩ নং বিধি অনুসারে শাসিত হত ১লা মে ১৯০০ খৃষ্টাব্দ তারিখে ব্রিটিশ সরকার Chittagong Hill Tracts Regulation ১৯০০ অপঃ নামে আরও একটি আইন জারী করে উক্ত আইন মূলে ১৯০০ খৃষ্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্রগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা শাসিত হয়ে আসছেউল্লেখ্য, ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন পাশ হলেও ১৯০০ সালের উক্ত পার্বত্য চট্রগ্রাম শাসন বিধি–আইন এ অঞ্চলে অব্যাহত থাকে; যাতে অন্য জেলা থেকে আগত উপজাতিদের, এ জেলায় জমি বন্দোস্ত পাবার ব্যাপারে কড়া বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছিলবৃটি রাজত্বকালে ১৯২০ খৃষ্টাব্দ থেকে পার্বত্য চট্রগ্রামকে Excluded Area, ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে Tribal Area, ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে Chittagong Hill Tracts Regulation ১৯০০ অপঃ বাতিল হয়ে এ অঞ্চল সাধারণ এলাকা হিসাবে পরিগণিত হয়েছিলোপরবর্তীতে, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দাবীর প্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকার এক নির্বাহী আদেশে Chittagong Hill Tracts Regulation ১৯০০ অপঃ পুনর্বহাল করতঃ এ এলাকাকে Tribal Area নামে ঘোষনা প্রধান করে এ সময় তৎকালীন সরকার কর্তৃক অত্র এলাকায় বাঙ্গালী ও উপজাতিদের মধ্য জনসংখ্যাভারসাম্য আনয়নের প্রচেষ্টায় উক্ত বিধির ব্যাপক সংশোধনের মাধ্যমে অ-উপজাতিদের এ অঞ্চলের জমির মালিকানা লাভের পথ সুগম করে দেয়াসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহন করা হলে সংশ্লিষ্ট উপজাতিদের সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়স্বাধীনতাত্তোরকালে বিভিন্ন সময়ে সরকার উপজাতি ও -উপজাতিদের মধ্যে জনসংখ্যা সংক্রান্ত ভারসাম্য আনয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেপার্বত্যাঞ্চলের রাজনৈতিক পটভূমির ধারাবাহিকতায় আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়পার্বত্যাঞ্চলের সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং এ চুক্তির ফলে পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি স্থাপিত হয় জনসংখ্যা সংক্রান্ত ভারসাম্য রক্ষার কার্যক্রমও বর্তমানে সীমিত আকারে অব্যাহত রয়েছেস্বাধীনতা উত্তরকালে খাগড়াছড়ি জেলায় সামগ্রিক উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মিত হয়এছাড়া রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়নের ফলে জেলা সদরের সাথে সকল উপজেলার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছেঅধিকন্তু, স্থানী উপজাতি জনগোষ্ঠীর নান্দনিক সংস্কৃতির সাথে দেশের বৃহত্তর সংস্কৃতির সংযোগ স্থাপিত হওয়ায় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার রাজনৈতিক, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সংস্কৃতিঅংঙ্গনে আমুল পরির্বতন সাধিত হয়খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে স্থানীয় প্রশাসনিক অংশীদারিত্বে বাঙ্গালিদের সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ০৯, চাকমাদের ০৯, ত্রিপুরাদের ০৬ ও মারমাদের ০৬

জেলার নামকরণ: খাগড়াছড়ি একটি নদীর নামনদীর পাড়ে খাগড়া বন থাকায় পরবর্তীকালে তা পরিষ্কার করে জনবসতি গড়ে উঠে, ফলে তখন থেকেই এটি খাগড়াছড়ি নামে পরিচিতি লাভ করে১৭০০ সালে এই এলাকাটি কার্পাস মহাল নামে পরিচিত ছিলো। তৎকালীন এর বৃটি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এর সাথে এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তুলা কার্পাস ট্যাক্স হিসাবে দিতে হত



রাংগামাটি
:

শাসকদের মধ্য বিবাদ ভৌগলিক ভাবে হিমালয় অঞ্চল হতে দূরে দক্ষিনে শাখা প্রশাখায় বিস্তৃত পাহাড়ি এলাকা নিয়ে বৃহত্তর পার্বত্য চট্রগ্রাম জেলার অবস্থান আসাম ও পার্বত্য ত্রিপুরা হতে আরাকান ও বার্মার সীমান্ত পর্যন্ত ফলে পার্বত্য চট্রগ্রাম ও চট্রগ্রাম জেলা ছিল পার্বত্য ত্রিপুরা এবং আরাকান শাসকদের একটি বিবাদের বিষয় আর এ কারণে এই অঞ্চলের রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা যুজা রুপা (বিরা রাজা) ৫৯০ খৃষ্টাব্দে পার্বত্য চট্রগ্রামের রাজাকে পরাজিত করেন এবং রাংগামাটিতে তার রাজধানী স্থাপন করেনআবার ঐতিহ্যগত মতানুসারে, পার্বত্য ত্রিপুরার রাজা উদয়গিরি কিলয় এবং মলয় নামের দুই ভাইকে রিয়াং এলাকার অফিসার ইন-চার্জ নিয়োগ করেন তারা মাতামুহুরি নদীর দক্ষিণে পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করতেন ৯৫৩ খৃষ্টাব্দে আরাকান রাজা সুলা সান্দ্র (Tsula Tsandra) (৯৫১-৯৫৭) বৃহত্তর পার্বত্য চট্রগ্রা ও চট্রগ্রাম দখল করেন পরবর্তীতে ১২খৃষ্টাব্দে ত্রিপুরার রাজা পুনরায় এ অঞ্চল দখল করেন সুলতানী আমলে সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ (১৩৩৮-৪৯) চট্রগ্রাম (সম্ভবতঃ পার্বত্য চট্রগ্রামের অংশসহ) জয় করেন১৪০৬ খৃষ্টাব্দে সুয়া মংজিআরাকানের সিংহাসন জোর পূর্বক দখল করেন এবং আরাকান রাজা মং সুয়ামন ওরফে ন্যারা মিখলা (১৪০৪-৩৪)কে গৌড়ের সুলতান জালাল উদ্দিন মুহম্মাদ শাহ (১৪১৮-৩১)-এর দরবারে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেন১৪১৮ সালে চাকমা রাজা মউন স্নী বৌদ্ধ মতাদর্শের প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপনের অভিযোগে বার্মার উর্ধাঞ্চল হতে বিতাড়িত হন তিনি তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের আলীকদম নামক স্থানে মুসলিম অফিসারের অধীনে আশ্রয় গ্রহন করেন এবং রামু ও টেকনাফে চাকমাদের বসতি স্থাপন করেন১৪৩০ খৃষ্টাব্দে সুলতান জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ শাহের অধীনে ওয়ালী খান নামের একজন মিলিটারী অফিসার চট্টগ্রামে নিয়োজিত থাকাকালে যখন সুয়া মংজিৎকে বিতাড়িত করে মং সুয়ামনকে আরাকান এর সিংহাসন পুনরুদ্ধার করে দিতে নির্দেশিত হন, তখন তিনি গৌড়ের সুলতানের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহী হন। সুলতান জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ শাহ একদল সৈন্য প্রের করলে তারা ওয়ালী খান কে হত্যা করে এবং আরাকা আক্রমন করে মগ রাজা মং সুয়ামনকে আরাকানে সিংহাসন পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে। আরাকানী ধিপাত্য রাজা গনেশ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজ বংশের সর্বশেষ রাজা সুলতান শামসুদ্দিন আহমেদ শাহ (১৪৩১-৪২) আরাকান সীমান্তের দুর্গকে অতিরিক্ত সৈন্য দিয়ে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সতর্ক ছিলেন না বলে মং সুয়ামনের উত্তরসুরী মংখারী ওরফে আলীখান (১৪৩৪-৩৯) পূর্ববর্তী বছরগুলোতে মুসলিমদের নিকট হারানো রাজ্য পুনঃদখলের জন্য আক্রমন করেন এবং চাকমাদেরকে রামু ও টেকনা হতে বহিস্কার করতে সক্ষম হন। এ অঞ্চল বিরোধপূর্ন থেকে যায় এবং কয়েক বছর পর্যন্ত আরাকানীদের আধিপাত্য মেনে নিতে হয়।

ইলিয়াছ শাহীর আগমন: ইলিয়াছ শাহী সুলতান রুকুনুদ্দিন মোবারক শাহ্‌ (১৪৫৯-৭৪) তার শাসনের শেষ দিকে সেখানে শাসন ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯) এর শাসন আমলে আরাকানী রাজা স্বল্প সময়ের জন্য তার রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। রাজা মালার উদ্ধৃতি অনুযায়ী ত্রিপুরার রাজা সাথে হুসাইন শাহের তন্ময়তার সুযোগ নিয়েছিলেন আরাকানী রাজা ইহা ছিল স্পষ্টরুপে আরাকানীদের বিনা উত্তেজনায় আক্রমন, যা ছিল সম্ভবতঃ যুবরাজ  নুসরাতের নেতৃত্বাধীনে সেনা অভিযান। তাকে সহায়তা করেন পরাগাল খান, যিনি পরবর্তীতে জয়লাভ করা রাজ্যের মিলিটারী গভর্ণর হয়। পরাগাল এবং তৎপরে তার পুত্র ছুটি খান দৃভাবে আরাকানীদের দক্ষিণ দিকে তাড়িয়ে দেন এবং ত্রিপুরা রাজার দিকে সতর্ক নজর রাখেন১৫১৭ খৃষ্টাব্দে পর্তুগীজ দূত যোয়া দি সিলভিরো চট্টগ্রামে অবতরন করেন এবং বন্দরটি বাংলা রাজার দখলে দেখতে পান। জয়চন্দ্র (১৪৮২-১৫৩১) নামের একজন বৌদ্ধ ধর্মালম্বী  মগ চীফ চক্রশা লাতে বাংলার সুলতানের কর দাতা হিসাবে কর্ণফুলী ও সাংগু নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে শাসন ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন পুনরায় আরাকানী দখল ত্রিপুরা রাজামালা গ্রন্থ অনুসারে ধন্যা মানিক্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ত্রিপুরা রাজবংশীয় শাসন ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৫১৫ খৃষ্টাব্দে আরাকান আক্রমন করেন। কিন্তু আরাকানী মগ রাজা মিন্যাজা ১৫১৮ খৃষ্টাব্দে রাজ্যের কিছু অংশ পুনঃজয় করেন একই বছরে চাকমা চীফ চনু আরাকানী মগ রাজার নিকট বশ্যতা স্বীকার করেন এবং ঐ এলাকা আরাকানী গভর্ণর হিসাবে নিযুক্ত ধ্যরাং গিরির মাধ্যমে রাজার নিকট ২টি চুন রং করা শ্বেত হস্তী উপঢৌকন হিসাবে প্রেরন করেন। আরাকানী রাজা সন্তুষ্ট হয়ে চাকমা রাজাকে কুফরম্ন উপাধী প্রধান করেন এবং চাকমা রাজার কন্যাকে ১৫২০ খৃষ্টাব্দে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে ত্রিপুরার দেবমানিক্য আরাকানীদের হাত থেকে রাজ্যের কিছু অংশ ১৫২২ খৃষ্টাব্দে অস্থায়ী ভাবে নিয়ে যান। কিন্তু আরাকানের মিবিন ওরফে যাবূক শাহ (১৫৩১-৫৩) পুনঃরায় ১৫৩১ খৃষ্টাব্দে রাজ্যের দখল গ্রহন করেন

শের শাহের শাসন: শের শাহের যুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বন্দরটি হয়ে ওঠে পর্তূগীজ সৈন্যদের মিলনস্থান (ঘাঁটি) শের শাহের ডেপুটি ঐ জায়গা দখল করেন। কিন্তু তিনি নিজেই চট্টগ্রামস্থ পর্তূগীজ কলোনীর প্রধান নূন ফারনান্ডিজ ফ্রাইওর কর্তৃক যুদ্ধবন্দী হয়ে যান। অবশ্য শেষ পর্যন্ত এ এলাকায় শের শাহের শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ত্রিপুরার বিজয় মানিক্য ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলার ইতিহাসে ত্রিপুরার রাজাগন উল্লেখযোগ্য স্থান করে নেন।আইন-ই-আকবরীতে বর্ণিত মতে, বিজয় মানিক্য (১৫৪০-৭১) ছিলেন একজন ক্ষমতাশালী শাসক। তিনি মুসলিমদের নিকট হতে চট্টগ্রাম অঞ্চলকে পুনঃলাভ করেন। যদিও সিকান্দার শাহ ত্রিপুরা আক্রমন করেন এবং রাজধানী লুন্ঠন করেন। অমর মানিক্য (১৫৭৭-৮৬) আরাকানি রাজা সিকান্দার শাহের কাছে করুণভাবে পরাজয় বরণ করেন। আরাকানীদের অভিযান ধারণা করা হয় যে, আরাকানী রাজা পুনরায় ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে এ জেলা আক্রমন করেন। রাফ ফিচ ১৫৮৫ সালে লিখেছেন যে, এ জেলাটি ছিল আরাকানী রাজাদের অধীনে যারা ত্রিপুরার রাজাদের সাথে এর আধিপত্য নিয়ে অবিরত যুদ্ধে মগ্ন থাকতেন। দক্ষিন-পূর্ব বাংলার বৃহৎ অংশে সম্রাট আকবরের শাসন ক্ষমতা সম্প্রসারণের জন্য তার নাম মাত্র বঙ্গ জয়ের অব্যবহিত পরে এ অঞ্চলের অভ্যন্তরীন যোগাযোগ রাজনৈতিক জটিল অবস্থার সুযোগ নেয় আরাকানের রাজা (বাহারী স্থানে বলা হয় রাখাং)আরাকানের রাজা মং ফালং সম্পূর্ন চট্টগ্রাম অঞ্চলকে তার কর্তৃত্বে নিয়ে আসেন এবং নোয়াখালি ও ত্রিপুরার বৃহৎ অংশ দখল করে নেয়। তার পুত্র মংখামন কয়েকবার বাংলায় সামরিক অভিযান চালায় এবং মোলদের জন্য সে ভীতির কারন হয়ে দাঁড়ায়। আরাকানি রাজা সচরাচর এক ভাই কিংবা দ্বিতীয় পুত্রকে এ জেলায় অফিসার-ইন-চার্জ নিয়োগ করতেন। ১৬০১ খ্রিষ্টাব্দে মং রাজাগ্নি আরবী, বার্মিজ ও দেবনাগরী তিনটি ভাষায় মুসলিম ও বার্মিজ পদবীসহ মুদ্রার প্রচলন করেন। পর্তূগীজ জলদূস্য (যাদেরকে সাধারনত ফিরিঙ্গি জলদূস্য বলা হয়) আরাকানি রাজার অধিকৃত এলাকায় ২ টি শক্তিশালী উপনিবেশ স্থাপন করলেও (একটি চট্টগ্রাম শহরে ২০ মাইল দক্ষিনে দিয়াংগাতে এবং অপরটি আরাকান উপকূলের সিরিয়ামে) তারা পুরোপুরি ভাবে আরাকান রাজার কাছে আত্নসমর্পন করেনি। উত্তর পশ্চিমে বঙ্গদেশ এবং দক্ষিনে আরাকান রাজ্যের মধ্যবর্তী এলাকায় চট্টগ্রামের পাহাড়ী অঞ্চলটির অবস্থান হওয়ায় ফিরিঙ্গি জলদূস্যদের চট্টগ্রামে একটি শক্তিশালী দূর্গ ছিল এবং এখান হতে তারা দক্ষিন ও পুর্ব বাংলার উপকূলীয় এলাকায় লুতরাজের জন্য অবিরত হানা দিত। দিয়াঙ্গা ও সিরিয়ামের ফিরিঙ্গি জলদূস্যরা প্রায়শঃ তাদের রাজনৈতিক অধিস্বামী আরাকানি রাজার সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হতো। মগদের অত্যাচার পর্তূগীজ লুন্ঠনকারীরা চট্টগ্রাম এলাকায় স্থানীয় মগদের নিবিড় সহায়তায় বঙ্গদেশে লুতরাজ কাজ পরিচালনা করতো। এই মগরা ছিল সমভাবে দক্ষতা সম্পন্ন নাবিক, নিষ্ঠুর ও দুঃসাহসী জাতি এবং তারা অনুরুপ দস্যুবৃত্তি করেই জীবিকা নির্বাহ করত। Fathi এর লেখক এবং ইউরোপীয় পরিব্রাজক Bernier এর লেখায় সাক্ষ্য বহন করে যে, এই আধাসভ্য মংগোলীয় যাযাবরদের অদ্ভূত মুখাবয়, রীতি ও প্রথার জন্য এবং তারা পুনঃ পুন নির্ম আক্রমন করে জনগনের গুরুতর ক্ষতি সাধন ও নিদারুন দুঃখ কষ্টের সৃষ্টি করতো বিধায় তাদেরকে ঘৃনার পাত্রবলে মোগল অফিসার ও বাংলার লোকেরা চিহ্নিত করেন। মোগল আমল ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এ অঞ্চল আরাকানীদের দখলে ছিল। ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরংগজেব আলমগীরের অধীনে বাংলার গভর্নর শায়েস্তা খান আরাকান দরবার ও পর্তুগীজদের মাঝে দ্বন্দের সু্যোগ নিয়ে এ অঞ্চল জয়লাভ করেন এবং ধর্ম প্রা সম্রাটের নির্দেশে চাটঁগার নাম পরিবর্তন করে ইসলামাবাদ রাখেন। ১৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে জালাল খাঁ রাজা হওয়া সমতলবাসীদের সাথে পার্বত্যবাসীদের বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের মুঘল শাসককে ১১ মণ কার্পাস তুলা দিতে চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু মুঘল প্রশসকগণ পার্বত্য আওঞ্চলকে তাদের নিজেদের অধীনস্থ অঞ্চল হিসেবে “কার্পাস মহল” নাম দিয়ে কর আদায় করতে চাইলে চাকমা রাজা কর দিতে অস্বীকার করেন এবং তিনি ১৭২৪ খ্রিষ্টাব্দে আরাকনে চলে যান। তবে মোগল প্রসাশকে ১৭২৪ হতে ১৭৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ফতে খাঁ ১১ মণ কার্পাস কর দেন। ১৭৩৭ খ্রিষ্টাব্দে শেরমুস্ত খাঁ কার্পাস ক দেয়ার শর্তে কোদালা, শীলক, রাংগুনিয়া অঞ্চলের জমিদারী লাভ করেন। রাণী কালীন্দির মতে, রাজা সেরমস্ত খাঁর পর শুকদেব রায়, তারপর শের দৌলত খাঁ, পরেজান বক্স খাঁ, আর্য্যপুত্র ধরমবক্স খাঁ এবং পরে কালিন্দি রাণী নিজে ছিলেন চাকমা রাজার দায়িত্বে। ১৭৫৮ খ্রিষ্টাব্দে রাজা শেরমুস্ত খাঁ মৃত্যু বরন করেন। ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে অর্ধ স্বাধীন নবাব মীর কাশি আলী খান কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোপমানীর নিকট সমর্পিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম মুঘলদের দখলে নিরাপদ ছিলো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ১৭৬০ খৃষ্টাব্দে চট্টগ্রাম এলাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নিকট সমর্পিত হওয়ার পরে প্রথম কয়েক বছর সম্ভবতঃ সমর্পিত অঞ্চলের ঐ অংশের প্রশাসনের উপরই কর্তৃপক্ষের বেশি মনযোগ নিবিষ্ট ছিল, যে অংশটি পরবর্তীকালে রেগুলেশন জেলা হিসাবে (চট্টগ্রাম) গঠিত হয়। পার্বত্য উপজাতীয় হেডম্যানদের কর্তৃত্ব তখন বহাল রাখা হয় এবং বাস্তবিক পক্ষে সরকারের অধিক্ষেত্রে কেবলমাত্র তুলা চাষের উপর কর হিসাবে রাজস্ব আদায়ের কাজই সম্প্রসারিত হয়। এই রাজস্ব পাহাড়ি উপজাতিদের নিকট হতে সরকারি কর্মকর্তা দ্বারা আদায় করা হতো না। বরং এমন এক ৩য় পক্ষ দ্বারা আদায় করা হতো যিনি উপজাতিদের প্রতিনিধি শাসকও ছিলেন না কিংবা উপজাতি সদস্যদের উপরও কোন নিয়ন্ত্রন ছিলো না। যেমন- রাজা জালাল খাঁর সময় বিনোদ চৌধুরী শেরমুস্ত খাঁশের জব্বার খাঁর সময় রাম চৌধুরী, শের দৌলত খাঁর সময় রামতনু সেন কার্পাস কর আদায়ের জন্য ঠিকাদারি নিযুক্ত ছিলেন ইংরেজদের বিরুদ্ধাচরণ ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা শের দৌলত খাঁ ইংরেজদের কর প্রদান বন্ধ করে দেন। ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুর পর পুত্র জানবক্স খাঁ অধিক শক্তি নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধাচরণ করেন। তিনি পার্বত্য অঞ্চল হতে গাছ, বাঁশ,, বেত প্রভৃতি বন সম্পদ সংগ্রহ করা ও পার্বত্য এলাকা সংলগ্ন জমিতে সমতলবাসীদের চাষ করা নিষিদ্ধ করে দেন অপরপক্ষে ইংরেজগণও পার্বত্য অঞ্চলে শুটকি, তামাক, লবণ, চিটাগুড়া প্রভৃতি প্রেরন বন্ধ করে দেন। তারপর রাজা জা বক্স খাঁকে দমন করার জন্য মেজর এলাকারকে (Ellerkar) প্রেরন করা হয়। তখন রাজা জা বক্স খাঁ কলকাতায় গিয়ে লেঃ গভর্ণরের নিকত আত্নসমর্পণ করেন। জান বক্স খাঁ ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরন করেন পরর্বতীকালে আর কোন রাজা ইংরেজদের বিরুদ্ধাচরণ করেনি

রোনা খানের বিদ্রোহ: ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামস্থ কোম্পানীর প্রধান গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসকে এপ্রিল মাসে লিখে জানায় যে, এক পর্বতবাসী রোনা খান কোম্পানীর জমিদারদের উপর বিভিন্ন রকম ট্যাক্স বলপূর্বক আদায় করে এবং কিছু দাবি তুলে নিপিড়ন করছে। রোনা খান তাকে সাহায্য করার জন্য কুকীদের একটা বড় দলকে সংগে নেন। তারা পাহাড়ের অভ্যন্তরে দূরে বসবাস করত এবং কোন আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করত না। তারা উলংগ থাকতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক এ বিদ্রোহ দমন করা হয়। এ বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে পাহাড়ী লোকদেরকেও চট্টগ্রামের প্রতিবেশি জেলার হাট বাজারে প্রবেশ অধিকার বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু কুকিরা তারপরেও অবিরত গোলযোগ সৃষ্টি করত১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে নভেম্বর মাসে চট্টগ্রামস্থ কোম্পানি প্রধান ২২তম ব্যাটালিয়ানের কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন (পরে মেজর) এলাকা (Ellerker)-কে কিছু সৈন্য পাঠিয়ে অধিবাসিদের রক্ষা করার জন্য নির্দেশ দেন। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে গভর্ণর চট্টগ্রামের চিফ-কে রিপোর্ট দিতে নির্দেশ দেন যে, পাহাড়ী লোকদের কে নিম্ন অঞ্চলে চাষাবাদের সুযোগ দিয়ে মুক্তিকামী প্রজা হিসাবে বসবাসে ব্যবস্থা করে নিবৃত করা যায় কী না? কিন্তু এ প্রস্তাবে প্রকৃতপক্ষে সুফল পাওয়া যায়নি।

আরাকানি উপজাতীর আগমন: ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জুন তারিখে আরাকানি রাজা কর্তৃক চট্টগ্রামের চীফের প্রতি লেখা একটি চিঠি হতে কিছু চমকপ্রদ ঐতিহাসিক তথ্য জানা যায় আরাকান হতে পালিয়ে আসা কিছু উপজাতির নাম রাজা উল্লেখ করেছিলেন, যারা চট্টগ্রামের পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিল এবং উভয় দেশের জনগণের উপরই অত্যাচার করতো। এই চিঠিতে পার্বত্য অঞ্চলে বর্তমানে বসবাসরত অন্ততঃ চারটি উপজাতির নাম উল্লেখ পাওয়া যায় যেমন- মগ, চাকমা, ম্যারিং বা মুরং এবং লাইস (পাংখু এবং বনযোগী)। আরাকানী রাজা চেয়েছিলেন যে, এ সকল দস্যুদেরকে পার্বত্য এলাকা হতে বিতাড়িত করা উচিত যাতে “আমাদের বন্ধুত্ব নিষ্কলঙ্ক থাকে এবং পর্যটকদের ও ব্যবসায়ীদের জন্য রাস্তা নিরাপদ থাকে”। উপজাতিরা বৃটিশ প্রজা নয়, কেবল করদাতা ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে মিঃ হ্যালহেড (Mr. Halhad) কমিশনার স্বীকৃতি দেন যে, পাহাড়ী উপজাতিরা বৃটিশ প্রজা নয়, তবে কেবল করদাতা। তিনি স্বীকার করেন যে, তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় বৃটিশদের হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। তাই একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী সরকারের নিকট প্রতিবেশের সুবাদে উপজাতীয় চিফগণ ধাপে ধাপে বৃটিশ প্রভাবের অধীনে আসে এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে প্রত্যেক নেতৃস্থানীয় চীফগণ চট্টগ্রাম কালেক্টরকে সুনির্দিষ্ট কর দিতে অথবা পাহাড়ী অধিবাসী ও সমতলের মানুষের মধ্যে মুক্ত ব্যবসার (Free Trade) সুযোগ নেওয়ার জন্য বার্ষিক উপহার দিত। প্রথম দিকে ইহার পরিমাণ হ্রাস বৃদ্ধি হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে তা বিশেষ ও নির্দিষ্ট হারে ধার্য হয়। অবশেষে তা কর হিসেবে না হয়ে রাজস্ব হিসেবেই রাষ্ট্রকে প্রদানের জন্য নির্ধারিত হয়। সরকার তারপরেও পার্বত্য অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপ করতো না। উল্লেখ্য, চাকমা রাজাগণের মধ্যে খাঁ উপাধির শেষ রাজা ছিলো ধরম বক্স খাঁ। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে রাজা ধরম বক্স খাঁর মৃত্যু হলে রাণী কালিন্দি রাজকার্য পরিচালনার দায়িত্ব হাতে নেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা সৃষ্টি দেশের মধ্যে বসবাসরত পাহাড়ী যে সকল উপজাতীদের নিয়ে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম গঠিত হয়েছে, তারা ছিল পূর্বদিকের অধিকতর দূরে অত্যাচারী উপজাতীদের জন্য অবিরত হামলার লক্ষ্য বস্তু। কাপ্তাই খালের পাড়ে অবস্থিত একটি দূর্গের উপর আক্রমণের পরিণতিতে ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে বিভাগীয় কমিশনার পাহাড়ী উপজাতিদের জন্য একজন সুপারিনটেন্ডেন্ট নিযুক্ত করে পার্বত্য অঞ্চলকে রেগুলেশন জেলা চট্টগ্রাম হতে পৃথক করার সুপারিশ করেন এই উভয় সুপারিশই গৃহী হয় এবং ১৮৬০ খিষ্টাব্দের ACT XXII দ্বারা ঐ বছরের ১লা আগস্ট তারিখে তা কার্যকর হয় পার্বত্য অঞ্চলকে রেগুলেশন জেলা চট্টগ্রাম হতে পৃথক করা হয় এবং একজন অফিসারকে পার্বত্য উপজাতিদের জন্য সুপারিনটেডেন্ট পদে নিযুক্ত করা হয় এভাবেই রেগুলেশন জেলার সিভিল, ক্রিমিনাল এবং রাজস্ব আদালত ও কর্মকর্তাদের অধিক্ষেত্র হতে পাহাড়ী ও বনাঞ্চলকে আলাদা করা হয় একজন Hill Superintendent নিয়োগের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল অধিক্ষেত্রের মধ্যে অত্যাচারী উপজাতিদের প্রতিরোধ করা এবং নিরীহ উপজাতিদের রক্ষা করাতার অধীনস্থ পাহাড়ী এলাকাকে তখন হতে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামে অভিহিত করা হয় (তার পূর্ব পর্যন্ত কার্পাস মহল বলা হত) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার সদর দপ্তর চন্দ্রঘোনাতে স্থাপিত হয়পরবর্তী কয়েক বছরের জন্য সীমান্তের শান্তি রক্ষা প্রতি বিশেষ মনযোগ দেয়া হয়এ সময়ে রাণী কালিন্দি চাকমা রাজার দায়িত্বে ছিলেন ১৮৬৭ খিষ্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার অফিসা-ইন-চার্জ এর পদবী সুপারিনটেনডেন্ট হতে পরিবর্তন করে জেলা প্রশাসক (Deputy Commissioner) করা হয় এবং সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের রাজস্ব ও বিচার ব্যবস্থার যাবতীয় বিষয়ে তাকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রধান করা হয়একই সময়ে জেলাকে যথোপযুক্ত ভাগ রে মহকুমা বিভক্ত করা হয় এবং সেগুলোতে অধীনস্থ কর্মকর্তাও নিয়োগ করা হয়১৮৬৮ খৃষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে চন্দ্রঘোনা হতে রাঙামাটি জেলা সদর দপ্তর স্থানান্তর করা হয়কুকী ও অন্যন্য উপজাতিদের আক্রমণ বৃটিশাসনকালে কুকীদের দ্বারা ১৮৫৯, ১৮৬৬, ১৮৬৯, ১৮৮৮ ও ১৮৯২ খৃষ্টাব্দে লুন্ঠনের প্রমান পাওয়া যায়১৮৬০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত বৃটিশ সরকার পাহাড়ী এলাকায় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয়ে সরকারি হস্তক্ষেপ করেনি। ঐ বছর অত্যাচারী উপজাতীয়রা, জাতিগতভাবে যাদেরকে কুকী বলা হয়, নিকটবর্তী তিপ্পেরা (Tippcrah) জেলা বৃটিশ প্রজাদের উপর প্রকাশ্য অত্যাচার করে হত্যাযজ্ঞ চালায়এ আক্রমণের ঘটনা এতই বড় ধরণের ছিল যে, সরকারের জন্য ইহা খুবই উদ্বিগ্নের কারণ হয়ে দাঁড়ায়এ ঘটনার ফলেই পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা সৃস্টি তরান্বিত হয়তিপ্পেরা জেলার কুকীদের আক্রমণে ১৮৬ জন বৃটিশ প্রজা খুন হয় এবং ১০০ জনকে বন্দী করা হয় পার্বত্য অঞ্চলের উত্তর–পূর্ব অংশে বসবাসরত উপজাতিরা উক্ত আক্রমণ ও বন্দিদশার ঘটনা স্পষ্টরুপেই হৃদয়ঙ্গম করে এবং সে অনুযায়ী ১৮৬১ খৃষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের জন্য বরকলে একটি সেনা সমাবেশ ঘটানো হয়লুসাই চীফ রতনপুয়া গ্রামটি বরকলের উত্তর পূর্বে ১৮ মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। ২৭ জানুয়ারি তারিখে ক্যাপ্টেন (পরে মেজর) র‌্যাবনের নেতৃত্বে হালকা অস্ত্রশস্ত্রসহ ২৩০ জন নির্বাচিত সিপাই ও ৪৫০ জন কুলির মাধ্যমে খাদ্য দ্রব্যাদি বহন করে বরকল হতে রতনপুয়ার গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ঐ গ্রামে প্রবেশ করা কঠিন ছিল। অবশেষে ঐ সৈন্যদল ৬ দিন পর্যন্ত হেঁটে অসংখ্য পাহাড়, নদী ও কাঁটাময় জঙ্গল অতিক্রম করে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারি তারিখে ঐ গ্রামে পৌঁছে। কুকীরা সমস্ত মূল্যবান সম্পদ সরিয়ে নিয়ে গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং গ্রাম থেকে সরে গিয়ে ওপেতে থেকে সৈন্যদের প্রতি আকস্মিক আক্রমনের পথ বেছে নেয়। উপজাতি লোকদের অপরাধের জন্য শাস্তিস্বরুপ মাত্র ১৫০০ মন চাল আগুনে ধ্বংস হয় – এ টুকুই যা ক্ষতি। এ অভিযানে এতটুকুই সাধ্য ছিল, যা সম্পাদন শেষে সৈন্যদেরকে বরকলে ফেরত আসতে হয়। অতঃপর সন্ধি স্থাপনের জন্য আলোচনা চলে এবং ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ক্টোবর মাসে রতনপুয়া আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেয়। পরবর্তী ২ বছর অর্থাৎ ১৮৬২ ও ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পার্বত্য এলাকায় শান্তি বিরাজ করে। কিন্তু ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে ১৫ ও ১৯ জানুয়ারিতে একদল সেন্দু ২টি গ্রাম আক্রমন করে ৫ জনকে হত্যা করে এবং মহিলা ও শিশুসহ ২৩ জনকে ক্রীতদাস হিসেবে নিয়ে যায়। একই বছরে এপ্রিল মাসে একই উপজাতি দুস্কৃতিকারীরা ২৬ জনের একটি বাঙালি কাঠুরিয়া দলকে আক্রমন করে ৫ জনকে গুলি করে ও ৯ জনকে আটক করে। অতঃপর তারা একটি খিয়াংথা গ্রামে আক্রমন করে এবং ৫৬ জন অধিবাসীর মধ্যে ৬ জনকে হত্যা করে ও ৩০ জনকে বন্দী করে নিয়ে যায়। ১৮৬৫-৬৬ সনে সেন্দুরা পার্বত্য অঞ্চলে আরও ২ টি হামলা করে। প্রথমবারে ৬ জনকে এবং দ্বিতীয়বারে ২০ জনেরও অধিক ব্যক্তিকে বন্দী করে নিয়ে যায়। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে লুসাই-এর হলং জাতি আরো গুরুতর প্রকাশ্যে অত্যাচার চালায়। এ অত্যাচার চালায়  ৬ই জুলায় তখন তারা বনযোগী উপজাতিদের ৩ টি গ্রামের ক্ষতি করে তাদেরকে পার্বত্য অঞ্চলের দক্ষিনে উপত্যকায় বোমাং কুকী বলা হতো তাদেরই একটি বিচ্ছিন্ন দল বৃটিশ রাজ্যের কর্ণফুলি নদীর শখা কাপ্তাই খালে ঢুকে পড়ে এবং সেখনে একটি গ্রাম ধ্বংস করে তারা ৮০ জনকে বন্দি হিসাবে নিয়ে যায় এবং ৪ জনকে হত্যা করে এ আক্রমনটি উল্লেখযোগ্য ছিল কারন, তখন ঘটনাটি ঘটে বর্ষা মৌসুমে, যখন কুকীরা সাধারণতঃ কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকতো এবং প্রতিকুল মৌসুমে ও অনতিক্রম্য বাঁধার কারনে অভিযান চালানো কষ্টকর ছিল ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১২ই জানুয়ারীতে হলং জাতি পুনরায় বোমাং অঞ্চলের খিয়াংথা (মগ) গ্রামে হানা দিয়ে ১১ জনকে হত্যা ও ৩৫ জনকে দাসত্বের জন্য নিয়ে যায় ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে কোন হামলা হয়নি কিন্তু ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারীতে সাঙ্গু নদীর উপর চিমা পুলিশ ফাঁড়িতে একটি হামলা হয় এবং ১০ জনের গার্ড পরাজিত হয় ও ফাড়িটি ধ্বংস হয় ৭ জন নিহত হয় এবং সমস্ত গার্ডের মহিলা ও শিশুদের বন্দি হিসাবে নিয়ে যায় পরের মাসেই পুলিশ ফাড়িটি পুনঃনির্মিত হওয়ার পর সেখান হতে আধা ঘন্টার হাঁটা পথ দুরে অবস্থিত একটি গ্রামে ১৮৭০ সনের ১৯শে জুলাই ভোরে ৪০/৫০ জনের একটি দল পুনরায় আক্রমন করে এবং ৪ ব্যক্তি ও ৬ শিশুকে আটক করে নিয়ে যায় আবার চিমা ও পিন্দুর মাঝামাঝি স্থানে সাঙ্গু নদীর পাড়ে একটি গ্রামে একই বছরের ডিসেম্বর মাসে আরো একটি আক্রমন সংঘটিত হয় এতে ২ জন নিহত এবং ১ জন বন্দি হয় ১৮৭১ সনে কোন হামলা হয়নি কিন্ত ১৮৭২ সনের জানুয়ারীতে একটি সেন্দু দল পিন্দু সীমান্ত পুলিশ ফাঁড়িতে আকস্মিক হামলা চালায় এ অসম সাহসিক কর্মটি সংঘটিত হয়েছিল সুসংহত ভাবেই তবে হামলাকারীদের কয়েকজন প্রবেশ পথেই প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় এবং তাদেরকে শীঘ্রই ১৮৭০­-৭১ সনে লুসাই এর হলং উপজাতিরা কেচার (Cacher) এর প্রতিবেশী বৃটিশ জেলায় বেশ কয়েকবার অস্বাভাবিক উত্যক্ত হবার মতো আক্রমণ সংঘটিত করে, যাতে কয়েকজন ইউরোপীয়কে জীবন বিসর্জন দিতে হয় এছাড়া একজন রোপনকারীর কন্যাসহ স্থানীয় কয়েকজন বৃটিশ প্রজাকে আক্রমণকারীরা বন্দী করে নিয়ে যায় এ সকল নির্যাতন অত্যাচারের ঘটনা তৎকালীন সরকারকে কার্যকর প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ করে এবং লুসাই অঞ্চলে একই সাথে ২ টি প্রতি আক্রমন পরিচালিত হয় একটি কেচার হতে জেনারেল বাউচারের নেতৃত্বে এবং অপরটি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল হতে জেনারেল ব্রাউনলো সি.বি. এর নেতৃত্বে পরিচালিত হয় এ যুদ্ধাভিযান পাঁচ মাস ব্যাপী চলে এবং সম্পুর্ণরুপে সফল হয় যুদ্ধবন্দীরা পুনরুদ্ধার হয় এবং অপরাধী উপজাতিরা আত্নসমর্পণ করে তাদেরকে বেআইনী ও অকারনে আক্রমণের জন্য যথেষ্ট পরিমান জরিমানা দিতে বাধ্য করাহয় তারপরে আর কোন গোলোযোগ সংঘটিত হয়নি যদিও ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে বর্ষা শুরু হওয়ার সামান্য পুর্বে সেন্দুদের দ্বারা একটি প্রচেষ্টা নেওয়া হয়, কিন্তু আক্রমনের সম্ভাব্য গ্রামটি  তাদের মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত ছিল বলে তারা দ্রুত পশ্চাদপসরন করে। সেন্দু জাতি ও  অন্যান্য উপজাতিরা উচ্চ ভূমিকে অধিকারে রেখে জেলার দক্ষিণাংশে আক্রমন করার জন্য আড়াল (প্রতিবন্ধক) হিসেবে ব্যবহার করত। কুকীরা এবং অন্যান্য উপজাতীরা মাঝে মাঝে আক্রমণ অব্যাহত রেখে ব্যাপক ধবংসযজ্ঞ চালাতো। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে উপজাতিদের বিরুদ্ধে একটি চুড়ান্ত সেনা অভিযান পরিচালিত হয় এবং তারপর হতে এ এলাকা সম্পুর্ণরুপে শান্ত হয়। জেলায় মর্যাদা হ্রাস বৃদ্ধি ও রেগুলেশান জারী ইতোপুর্বে ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশ কর্তৃক লুসাই পাহাড় দখল হওয়ার পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার গুরুত্ব অনেকটা হ্রাস প্রায় এবং এর মর্যাদা কমিয়ে মহকুমা করা হয়। তখন জেলাটি বিভাগীয় কমিশনারের অধীনস্থ একজন সহকারী কমিশনারের দায়িত্বে দেয়া হয়উল্লেখ্য, ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে রাণী কালিন্দির মৃত্যু হলে হরিশ চন্দ্র রায় রাজা হন। হরিশ্চন্দ্র ছিলেন ধরম বক্সের তৃতীয় রাণী হারীবির কন্যা মেনকার সন্তান। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে রাজা হরিশচন্দ্রের মৃত্যুর পর তার পুত্র ভুবন মোহন রায় রাজা হন। ১৯০০ সনের ১নং রেগুলেশান অনুযায়ী অঞ্চলটি পুনরায় জেলায় উন্নীত করা হয় এবং অফিসার ইন চার্জ এর পুরাতন পদবী সুপারিনটেন্ডেন্ট প্রত্যার্পণ করা হয়। জেলার সীমানা সংশোধন করে দেমাগিরির ১৫০০ জনের বসতিসহ পুর্বাংশের একটা লম্বা অংশ লুসাই জেলায় স্থানান্তর করা হয়। জেলাটি একই সময়ে চাকমা, মং ও বোমাং সার্কেলে বিভক্ত করা হয় এবং স্ব স্ব সার্কেল চীফদের কাছে ন্যস্ত করা হয়। সার্কেল চীফকে রাজস্ব আদায়ের এবং নিজ নিজ এলাকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রদান করা হয় চাকমা সার্কেলের অধীনে থাকে জেলার মধ্যবর্তী ও উত্তরাঞ্চল, বোমাং সার্কেলের অধীনে দক্ষিণাংশ এবং মং সার্কেলের অধীনে থাকে উত্তর পশ্চিমাংশ। এ সার্কেলগুলো অনুরুপ অংশ নিয়ে তিনটি মহকুমা রাংগামটি, বান্দরবান ও রামগড় স্থাপন করে মহাকুমা প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয় এবং তাদেরকে সার্কেল চিফের কার্যাবলি তদারকী ও লিঁয়াজো করার দায়িত্ব দেয়া হয়। রেগুলেশান সংশোধন ১৯০০ সালের রেগুলেশনটি পার্বত্য চট্টগ্রাম (সংশোধন) রেগুলেশান, ১৯২০ দ্বারা সংশোধিত হয় এবং সুপারিনটেন্ডেন্ট পদটি পরিবর্তন করে জেলা প্রশাসক ও এসিসট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্ট পদটিকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর করা হয়। দ্বৈত শাসনের প্রশাসনিক পদ্বতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে “শাসন বহির্ভূত অঞ্চল” হিসেবে নির্বাহী পরিষদের সহায়তায় গভর্ণরের একচেটিয়া দায়িত্বে সংরক্ষিত রাখা হয়। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা ভূবন মোহন রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নলিনাক্ষ রায় রাজা হন। চাকমা রাজাদের মধ্যে তিনিই প্রথম স্নাতক ডিগ্রি ধারী ছিলেন।

পাকিস্তান আমল ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাটি বৃটিশ শাসনের অধীন হতে পাকিস্তানের অধিক্ষেত্রে আসে এবং অনেক পরিবর্তন ও উন্নয়নের আওতায় আনা হয়। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা নলিনাক্ষ রায়ের মৃত্যু হলে তার পুত্র ত্রিদিব রায় চাকমা রাজা হন। তিনি পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিদের সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্বের সময় তিনি পাকিস্তানের সমর্থন করে সেখানে অবস্থান করে১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে কর্নফুলী নদীতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মান করা হলে পার্বত্য রাঙ্গামাটির ভৌলিক ও আর্থ সামাজিক অবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। প্রসংগতঃ উলেখ্য যে কাপ্তাই বাঁধের কারনে ১ লক্ষ অধিবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পাহাড়ী অধিবাসীদের মধ্যে অসন্তোষের কারণগুলোর মধ্যে তা ছিলো অন্যতম।

বাংলাদেশের ভ্যুদয় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭১ হতে ১৯৭৮ পর্যন্ত রাজা ত্রিদিব রায়ের জ্যেষ্ঠপুত্র দেবাশীষ রায় অপ্রাপ্ত বয়স্ক থাকায় ত্রিদি রায়ের কনিষ্ট ভ্রাতা কুমার সমিত রায় রাজকার্য পরিচালনা করেন। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দ হতে দেবাশীস রায় চাকমা রাজার দায়িত্ব গ্রহন করেন। ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ১০ সেপ্টেম্ব তারিখে নতুন মহাকুমা খাগড়াছড়ি, লামা ও কাপ্তাই গঠন করার জন্য পুরাতন মহকুমাগুলোও পূণঃগঠণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে এপ্রিল মাসে বান্দরবান ও লামা মহকুমা নিয়ে নতুন জেলা বান্দরবান গঠিত হয়। পরে ১৯৮৩ সালে জেনারেল এরশাদ সরকারের সময়ে সারাদেশে প্রশানিক সংস্কারের প্রক্রিয়ায় খাগড়াছড়ি ও রামগড় মহকুমা নিয়ে খাগড়াছাড়ি জেলা সৃষ্টি করা হয়। আরো পরে ১৯৮৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা, বান্দরবান পার্বত্য জেলা ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার আলাদা নামকরন ও সীমানা নির্ধারিত হয়। বর্তমানে রাঙ্গামাটি জেলার বৃহত্তর অংশ ও খাগড়াছড়ির জেলার কিছু অংশ নিয়ে চাকমা সার্কেল, খাগড়াছড়ি জেলার বৃহত্তর অংশ নিয়ে মং সার্কেল এবং বান্দরবান জেলার বৃহত্তর অংশ রাংগামাটি জেলার কিয়দংশ নিয়ে বোমাং সার্কেল রয়েছে। জেনারেল এরশাদের শাসনকালে ১৯৮৯ সালে তিন পার্বত্য জেলার স্থানীয় সরকার পরিষদ গঠন করে পরিষদগুলোকে অনেক ক্ষমতা প্রদান করা হয়। স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান পদটিকে উপমন্ত্রীর পদ মর্যাদা সম্পন্ন করা হয় ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার পরিষদের নামকরন পরিবর্তিত হয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং আরও বেশি ক্ষমতা প্রদান করা হয়। চুক্তির পরে তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে একটি আঞ্চলিক পরিষদঠিত হয়। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা সম্পন্নআঞ্চলিক পরিষদের সদর দপ্তর রাঙ্গামাটি শহরে বস্থিত। সুতারাং রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা এক জটিল ও বিশেষ ধরনের প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকর।

জেলার ঐতিহ্যঃ নৃ-বৈচিত্রের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত পার্বত্য অঞ্চলে। এখানে দীর্ঘদিন ধরে ১১ ভাষাভাষির ১২ টি জাতিসত্তা সহাবস্থান করছে। এমন বৈচিত্র্যের ঐক্যতান বিশ্বের কোন দেশে চোখে পড়ে না। এ পাহাড়ী ভূ-ভাগে এতগুলো জাতিসত্তা কখন, কিভাবে অভিবাসন করেছে তা বলা মুশকিল। কোন জাতিসত্তার কোন লিখিত দলিল দস্তাবেজ না থাকায় এতদঞ্চলের সঠিক ইতিহাস জানার কোন সুযোগ নেই। তবে এসব জাতিগুলোর রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। তারা সেগুলোকে যুগ যুগ ধরে সযতনে লালন করে আসছে। নিন্মে কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব, নৃত্য ও পূজার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো মাত্র।

বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুকঃ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চংগ্যাদের প্রধান ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উৎসব হচ্ছে বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক। এ লোকজ উৎসব চৈত্র মাসের শেষ দুইদিন ও বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটি নিয়ে তিন দিন ব্যাপী পালিত হয়। চাকমা সমাজে এই তিন দিনকে যথাক্রমে ফুলবিজু, মূলবিজু এবং গজ্জ্যেপজ্জ্যে বলা হয়। মারমা সমাজে দিনগুলোকে যথাক্রমে পাইংছোয়াই, সাংগ্রাই আফ ও সাংগ্রাই আপ্যাইং এবং ত্রিপুরা সমাজে হারি বৈসুক, বৈসুকমা ও বিসিকাতাল বলা হয়। উৎসবের প্রথম দিন ঘরদোর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়, ছেলে-মেয়েরা ভোরে ফুল তোলে এবং ঘর সাজায় আর কিশোর-কিশোরীরা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের স্নান করায়। উৎসবের দ্বিতীয় দিনে প্রত্যেক ঘরে রুচিসম্মত ও সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করা হয়। ঘরের দরজা থাকে সকলের জন্য উন্মুক্ত। খাবারের মধ্যে বিভিন্ন সবজি মিশিয়ে রান্না করা “পাজন” হচ্ছে অন্যতম। এ দিনেই মদের যথেচ্ছ ব্যবহার হয়ে থাকে। উৎসবের শেষ দিনে চাকমারা বাড়িতে ভাল খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করে। সাম্প্রতিক সময়ে এই দিনে বিহারে বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। অনেকেই আত্নীয় স্বজনের খোঁজ খবরও নিয়ে থাকেন। মারমারা এই দিনে “রিলং পোয়েহ্‌” বা Water Festival-এর আয়োজন করে। ত্রিপুরাদের বিশেষ আয়োজন হচ্ছে “গড়াইয়া নৃত্য”।

রাজ পুন্যাহঃ উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে “রাজপ্রথা” বিলুপ্ত হলেও  পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐতিহ্যবাহী “রাজাগণ” এখনো সামাজিক প্রধান হিসেবে শাসন কাজ পরিচালনা করছেন। রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় ১৭৭টি মৌজা নিয়ে “চাকমা সার্কেল” গঠিত। ‘রাজপুন্যাহ্‌’ হলো এমন একটি অনুষ্ঠান যেখানে “চাকমা রাজা” রাজ দরবারে আনুষ্ঠানিকভাবে বসেন এবং হেডম্যানদের নিকট হতে খাজনা আদায় করেন। পূর্বে এই অনুষ্ঠান প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হত। এ অনুষ্ঠানে রাজার অধীনস্থ হেডম্যান ও কারবারীগণ খাজনা পরিশোধের পাশাপাশি রাজাকে বিভিন্ন উপঢৌকন অর্পন করেন।

রিলং পোয়েহ্‌ বা Water Festival: রিলং পোয়েহ্মূলতঃ সাংগ্রাই আফ ও সাংগ্রাই আপ্যাইং অর্থাৎ সাংগ্রাই- এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয় মারমারা রাংগামাটি পার্বত্য জেলায় এ খেলাটিমৈত্রী পানি উৎসবনামে দীর্ঘ দিন ধরে পালন করছে এ উৎসবে যুবক-যুবতীরা অংশগ্রহন করে এ খেলায় যুবক হলে যুবতীর দিকে পানি ছিটিয়ে দেয় এবং যুবতী হলে যুবকের দিকে পানি ছিটিয়ে দেয় পানি উৎসবের মাধ্যমে তারা একে অপরকে শুভেচ্ছার বৃষ্টিতে সিক্ত করে এবং পুরনো বছরের সকল দুঃখ গ্লানি ধুয়ে মুছে পুত-পবিত্র হয়ে নতুন জীবনের দিকে পা বাড়ায়

গরাইয়া নৃত্যঃ এ নৃত্য ত্রিপুরা সমাজের মূলত পুরুষরা ঐতিহ্যবাহীগরাইয়া নৃত্যকরে থাকে পৌরাণিক কাহিনীর সুত্রে ধারণা করা হয়, শিব তার প্রিয়তমা স্ত্রী সতি বা গৌরীর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে যে নৃত্য করেছিল তার মাধ্যমে প্রলয়ংকারী বৃষ্টি সৃষ্টি হয়েছিল গৌরীর শোকে এই প্রলয়ংকারী নৃত্য করা হয়েছিল বলে এই নাচের নাম “গৌরী বা স্থানীয়ভাবে গরাইয়া নৃত্য”। এ সময় পাহাড়ী কৃষি পদ্ধতি জুমে ফসল বোনার সময়। বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতে জুমে ফসল বোনা হয়। স্ত্রী শোকে শোকাহত শিব কখন তার উদ্দাম নৃত্য করেছিল তা জানা না গেলেও পার্বত্যবাসী ত্রিপুরাদের জুমে ফসল বোনা শুরু হয় চৈত্র ও বৈশাখ মাসে। এই সময় বৃষ্টির অভাবে প্রকৃতি থাকে শুকনা খটখটে। তাই ধারণা করা হয় চৈত্র মাসের শেষে এবং বৈশাখ মাসের সপ্তাহব্যাপী এই নৃত্যের মূল উদ্দেশ্য বৃষ্টি আহ্বান, শস্যক্ষেতের সমৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগ ব্যাধি থেকে মুক্তি।

থানমানাঃ থান অর্থ স্থান বা ভূমি আর মানা অর্থ আরাধনা বা পূজা করা। চাকমা সমাজে সমষ্টিগত পূজার মধ্যে “থানমানা” উল্লেখযোগ্য। গ্রামের মঙ্গলের জন্য বাসত্ত দেবতা থানকে এ পূজা দেওয়া হয়। গ্রামবাসীরা পূজার আয়োজনের জন্য প্রত্যেক বাড়ি থেকে মোরগ বা মুরগি, চাল ও অর্থ সংগ্রহ করে। এরপর নদীতে তিনটি বাঁশ পুঁতে তার উপর গঙ্গাদেবীর জন্য ঘর তৈরি করা হয়। তার সম্মুখে মাটির বেদী প্রস্তুত করে বিয়েত্রার আসন চিহ্নিত করা হয়। ভুতের রাজার পুতা হয় গাছের ডাল। কাদার উপর বাশ পুতে এবং বেত দিয়ে নকশা করে ধান ও তুলা ইত্যাদি ফসলের প্রতিকৃতি সাজানো হয়। এ পুজায় শুকর ও মোরগ-মুরগি বলি দেওয়া হয়। কথিত আছে, ১৪ দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে এ পুজার আয়োজন করা হয়ে থাকে।
                                         বগালেক


বান্দরবানঃ

বান্দরবান জেলার নামকরণ নিয়ে একটা কিংবদন্তি রয়েছে। এলাকার বাসিন্দাদের প্রচলিত রুপকথায় আছে অত্র এলাকায় একসময় বাস করত অসংখ্য বানর। আর এই বানরগুলো শহরের প্রবেশমুখে ছড়ার পাড়ে পাহাড়ে প্রতিনিয়ত লবণ খেয়ে আসত। একসময় অনবরত বৃষ্টির কারণে ছড়ার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বানরের দল ছড়া পার হয়ে পাহাড়ে যেতে না পারায় একে অপরকে ধরে ধরে সারিবদ্ধভাবে ছড়া পার হয়। বানরের ছড়া পারাপারের এই দৃশ্য দেখতে পায় এই জনপদের মানুষ। এই সময় থেকে এই জায়গাটি পরিচিতি লাভ করে “ম্যাঅকছি ছড়া” হিসেবে। অর্থ্যাৎ মারমা ভাষায় “ম্যাঅক” অর্থ বানর আর “ছি” অর্থ বাঁধ। কালের প্রবাহে বাংলা ভাষাভাষির সাধারণ উচ্চারনে এই এলাকার নাম রুপ লাভ করে বান্দরবান হিসাবে। বর্তমানে সরকারী দলিলপত্রে বান্দরবান হিসাবে এই জেলার নাম স্থায়ী রুপ লাভ করেছে। তবে মার্মা ভাষায় বান্দারবানের নাম “রদ ক্যওচি ম্রো”। জেলা রুপে আবির্ভাব বৃটিশ শাসনামলে ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টাগ্রামকে জেলা ঘোষনা করা হয়। তৎকালীন সময়ে বান্দরবান পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার অধীন ছিলো। ক্যাপ্টেন ম্যাগ্রেথ ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার প্রথম সুপারিনট্যনডেন্ট। ১৮৬৭ সালে পার্বত্য চট্টাগ্রাম জেলার  সুপারিনট্যনডেন্ট পদটি কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা হয় এবং ১৮৬৭ সালে এই পদটির নামকরন করা হয় ডেপুটি কমিশনার। পার্বত্য চট্টাগ্রাম জেলার প্রথম ডেপুটি কমিশনার ছিলেন টি. এইচ. লুইন। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করা- চাকমা সার্কেল, মং সার্কেল এবং বোমাং সার্কেল। প্রত্যেক সার্কেলের জন্য একজন সার্কেল চীফ নিযুক্ত ছিলেন। বান্দরবান তৎকালীন সময়ে বোমাং সার্কেলের অন্তর্ভূক্ত ছিলো। বোমাং সার্কেলের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার কারনে এই জেলার আদি নাম বোমাং থং। বান্দরবান জেলা ১৯৫১ সালে মহকুমা হিসেবে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করে। এটি রাঙামাটি জেলার প্রশাসনিক ইউনিট ছিল। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ১৮ই এপ্রিল, তৎকালীন লামা মহকুমার ভৌগলিক ও প্রশাসনিক সীমানাসহ ৭টি উপজেলার সমন্বয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

জেলার ঐতিহ্যঃ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাংগামাটি এবং কক্সবাজার থেকে বান্দরবানে বাস যোগাযোগ রয়েছে। বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৪ কিঃমিঃ দূরে বালাঘাটায় রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মন্দির। এটি সম্পুর্নরূপে দক্ষিন-পশ্চিম এশিয়ার মন্দিরগুলোর অনুকরনে তৈরি করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৌদ্ধ মুর্তিটি এখানে রয়েছে। স্থানীয় ভাবে এটি হলো “বুদ্ধ ধাতু জাদি”। এছাড়া শহরের মধ্যেই রয়েছে জাদি পাড়ার রাজ বিহার এবং উজানী পাড়ার বিহার। শহর থেকে চিম্বুকের পথে যেতে পড়বে বম ও ম্রো উপজাতিদের গ্রাম। প্রান্তিক হ্রদ, জীবন নগর এবং কিয়াচালং হ্রদ আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থান। রয়েছে মেঘলা সাফারী পার্ক, যেখানে রয়েছে দুটি সম্পুর্ন ঝুলন্ত সেতু। সাঙ্গু নদীতে নৌকা ভ্রমন, ভ্রমন পিয়াসীদের জন্য হতে পারে একটি মনোহর অভিজ্ঞতা। বান্দরবান শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শৈল প্রপাত একটি আকর্ষনীয় পাহাড়ি ঝর্না। এছাড়া বাংলাদেশের সর্বোচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ তানিংডং এবং বৃহত্তম পর্বত শৃংগ কেওক্রাডং এই বান্দরবান জেলাতেই অবস্থিত। মৌসুমগুলোতে এই দুটি পর্বত শৃংগে আরোহন করার জন্য পর্যটকদের ভীড় জমে উঠে। পর্যটকরা সাধারনত বগা লেক থেকে হেঁটে কেওক্রাডং-এ যান। অনেকে আছেন যারা কেওক্রাডং না গিয়ে বগালেক থেকে ফিরে আসেন। এ হ্রদটিও বিশেষ দর্শনীয় স্থান। হ্রদ সন্নিহিত এলাকায় বম উপজাতিদের বাস। এছাড়া অন্যান্য আকর্ষনের মধ্য আছে- বাকলাই ঝর্না, বগালেক, বুদ্ধ ধাতু জাদি, চিম্বুক পাহাড় রেঞ্জ, চিনরি ঝিরি ঝর্ণা, ফাইপি ঝর্ণা, জাদিপাই ঝর্ণা, কেওক্রাডং, মেঘলা, মিরিঞ্জা পর্যটন, নাফামুখ, রেমাক্রি, নীলাচল, নীলগিরি, থানচি, পতং ঝিরি ঝর্ণা, প্রান্তিক লেক, রাজবিহার, উজানীপাড়া বিহার, রিজুক ঝর্না, সাংগু নদী, শৈল প্রপাত, তাজিডং, উপবন পর্যটন।

তথ্যসূত্রঃ সাপ্তাহিক আলোকিত পাহাড় ও তথ্য বাতায়ন, তিন পার্বত্য জেলা।
লেখকঃ মোঃ আনোয়ার হোসেন, শিক্ষক ও সাবেক সাংবাদিক, খাগড়াছড়ি।














একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ